প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের তালিকায় মধুপুরের চেয়ারম্যানের শ্বশুর-শ্যালকসহ ৫১ আত্মীয় নামে

মধুপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি করোনাকালে প্রধানমন্ত্রীর নগদ আর্থিক সহায়তাসহ সরকারি সুবিধা নেয়ার সব তালিকায় নিজের পরিবার ও স্বজনদের নাম দিয়ে সুবিধা পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলার শোলাকুড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আক্তার হোসেন ও সংশ্লিষ্ট ৩নং ওয়ার্ডের সদস্য ফরহাদ আলীর বিরুদ্ধে। তাদের এ স্বজনপ্রীতির কথা উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক দফতরে স্থানীয়রা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ৭ জুন টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ২ হাজার ৫০০ টাকা প্রাপ্তির তালিকায় ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নিজের তিন সহোদর, শ্বশুর, শ্যালক, চাচা, চাচাতো ভাই, মামা, মামাতো ভাই, ভগ্নিপতি, ভগ্নিপতির ভাইসহ স্বজনদের মধ্যে ৫১ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

 

 

জানা যায়, মধুপুর উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ৬ হাজার ১২০টি পরিবার প্রধানমন্ত্রীর ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকার এই ঈদ উপহার পাচ্ছে। বণ্টনে শোলাকুড়ি ইউনিয়ন পাচ্ছে ৩৩০টি পরিবারের জন্য ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা। চেয়ারম্যান মো. আক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে এ টাকা প্রাপ্তির তালিকা তৈরিতে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, এ ৩৩০ পরিবার ৯টি ওয়ার্ডে সমভাবে বণ্টিত হয়নি। ৮৬টি পরিবার তার নিজের ওয়ার্ডেই রেখেছেন। তার মধ্যে ৫১টি পরিবার তার নিকটাত্মীয়। একই পরিবারের একাধিক সদস্যকেও রাখা হয়েছে তালিকায়। সমাজের ধনাঢ্য, বিত্তশালী ও প্রবাসীরাও বাদ যাননি। তালিকায় সামর্থ্যবানের নামের ছড়াছড়ি রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এতে বঞ্চিত হয়েছেন প্রকৃত হতদরিদ্ররা।

 

 

ইউনিয়ন পরিষদের তালিকার ১৪০ ও ১৫৪ নম্বরে রয়েছেন আদিল হোসেন ও আলাল উদ্দিন নামে চেয়ারম্যানের দুই সহোদর, ১৯৫ ও ১৬৩ নম্বরে রয়েছে দুই শ্যালক আক্তার ও চান মিয়ার নাম। ১৯৬, ২০৬ ও ১৯৩ নম্বরে আছে শ্যালক পুত্র যথাক্রমে ফরমান আলী এবং সুপিন ও বিপ্লব নামের দুই সহোদর। আপন ভগ্নিপতি হযরত আলীর নাম ২০৯, ভগ্নিপতির সহোদর একিন আলী আছেন ২১০ নম্বরে।

 

চাচা আবদুর রহমান হক ও আপন মামা হাসেম আছেন ১৪৮ ও ২২৮ নম্বরে। ওসমান আলী নামে চাচার তিন সন্তান আপন, স্বপন ও আনিছুর তালিকাভুক্ত হয়েছেন যথাক্রমে ১৫৫, ১৮৩ ও ১৮২ নম্বরে। আবদুল করিম ও কালাম নামে দুই চাচাও আছেন তালিকার ১৩৪ ও ১৩৩ নম্বরে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, বিএনপি ও জামায়াত নেতা ছাড়াও ধনাঢ্য আরও অনেক লোকজনের নাম দেয়া হয়েছে ওই তালিকায়। যাদের মধ্যে পাকা বাড়ির মালিক, বড় বড় কলাবাগানের চাষী, ১০০ থেকে ২০০ মণ ধান উৎপাদনে সক্ষম চাষীর নামও আছে তালিকায়।

 

 

অভিযোগের সঙ্গে দেয়া তালিকার ২২ নম্বরে চেয়ারম্যানের শ্বশুর এছাহাক আলী, ৪৫ নম্বরে ওমান প্রবাসী হাবিজুরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। হাবিজুরের নামের পাশে থাকা মোবাইল নম্বরে ফোন করলে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে নাছিমা বেগম প্রধানমন্ত্রীর ২ হাজার ৫০০ টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ফরহাদ আলী জানান, চেয়ারম্যানের শ্বশুরসহ স্থানীয় বেশ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত কলা চাষীকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তারা এ সময় অসহায় এ জন্য। প্রধানমন্ত্রীর উপহার ২ হাজার ৫০০ টাকা পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন চেয়ারম্যানের বাল্যবন্ধু তোফাজ্জল হোসেন নামের এক ব্যক্তি। তিনি জানান, তার এক মেয়ে ভিকারুননিসায় পড়ে। ছেলে সদ্য প্রকৌশলী ডিগ্রি অর্জন করেছে।

 

 

 

চাকরি হয়নি। এ সময় ছেলেমেয়ে বাড়িতে। তারও আয়-রোজগার নেই। তবে অভিযোগে প্রদত্ত তালিকায় ৪১ নম্বরে থাকা ট্রাক শ্রমিক সমিতির শোলাকুড়ি বাজার শাখার সভাপতি আবদুস সামাদ তালিকায় তার নাম কীভাবে গেল জানেন না বলে তিনি জানান। তিনি আরও জানান, তার মোবাইল নম্বরে কোনো টাকা-পয়সা আসেনি। অভিযোগকারী শোলাকুড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য আবদুল আজিজ ও ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা জানান, প্রকৃত প্রাপ্যদের বাদ রেখে তালিকা হয়েছে। আমরা তালিকায় রাখার জন্য প্রকৃতদের কিছু নাম দিয়েছিলাম।

 

 

 

তাদের বাদ দেয়া হয়েছে। টাকা-পয়সার বিনিময়ে পুরো ইউনিয়নের তালিকায় আত্মীয়স্বজনসহ সচ্ছলদের স্থান হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান মো. আক্তার হোসেন জানান, যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে তালিকা হয়েছে। অনিয়ম দুর্নীতি হয়নি। তিনি জানান, চেয়ারম্যানের গরিব, দরিদ্র অসহায়-আত্মীয়স্বজন থাকতে পারবে না এমন তো নয়। আর তারা রাষ্ট্রীয় কোনো সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন না তাও নয়। তালিকায় তাদের নাম দেয়া অপরাধ হয়নি।

 

 

 

জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম জানান, অভিযোগ পেয়ে মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরা জানান, উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। সাত কর্মদিবসের মধ্যে কমিটি রিপোর্ট জমা দেবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.